হিলি (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার বোয়ালদাড় ইউনিয়নের বিশাপাড়া গ্রাম এখন পরিচিতি পেয়েছে ‘দুগ্ধ ভিলেজ’ নামে। গ্রামের ছোট-বড় ৬৮টি খামারে দেশি-বিদেশি জাতের শত শত গাভি পালন করা হচ্ছে। এসব খামার থেকে প্রতিদিন উৎপাদন হচ্ছে বিপুল পরিমাণ দুধ। দুধ বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন গ্রামের অনেক নারী-পুরুষ।
হাকিমপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দক্ষিণে বোয়ালদাড় ইউনিয়নে অবস্থিত বিশাপাড়া গ্রাম। গত প্রায় এক দশক ধরে গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে গাভি পালন ও দুধ উৎপাদনের প্রবণতা বাড়তে থাকে। স্থানীয় বেসরকারি সাহায্য সংস্থা এমবিএসকে এবং উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা খামারগুলো এখন গ্রামের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এমবিএসকের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান জানান, বিশাপাড়া গ্রামে বর্তমানে ছোট-বড় ৬৮টি খামার রয়েছে। এসব খামারে মোট গাভির সংখ্যা ২৮৭টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২৬৫টি। এক বছরে নতুন করে আরও ২২টি গাভি যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে ৯৬টি বকনা, ৭৪টি শংকর জাতের এবং ১১৭টি দেশি গাভি রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ৯৬টি গাভি থেকে প্রায় ৬৯৫ কেজি দুধ উৎপাদন হয়।
তিনি বলেন, গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষকে স্বাবলম্বী করতে বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে গাভি পালন ও খামার পরিচালনায় বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। দুধ বিক্রির আয় দিয়ে অনেক পরিবার নিজেদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করার পাশাপাশি সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি বিশাপাড়া গ্রামকে ‘দুগ্ধ ভিলেজ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি সদস্য ও খামারি মো. রফিকুল ইসলামের (৫২) সঙ্গে। তিনি জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে একটি ফ্রিজিয়ান জাতের গাভি দিয়ে খামার শুরু করেন। বর্তমানে তার খামারে নয়টি গাভি রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি দুধ দিচ্ছে এবং চারটি গাভি গর্ভবতী। এ ছাড়া খামারে পাঁচটি বাছুর রয়েছে।
রফিকুল ইসলাম বলেন, খামার শুরুর দিকে দুধ বিক্রি করতে সমস্যা হতো। বর্তমানে বিশাপাড়ার খাঁটি দুধের চাহিদা তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন বগুড়া শহর থেকে পাইকাররা খামারিদের বাড়ি থেকে দুধ কিনে নিয়ে যান। প্রতি লিটার দুধ ৬০ টাকা দরে বিক্রি করছেন তারা। গ্রামের খামারগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ লিটার দুধ বগুড়া শহরে যায়।
তিনি জানান, গত কয়েক বছরে তার খামার থেকে চারটি গাভি ও ছয়টি গরু প্রায় ২৭ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। বর্তমানে খামারে থাকা নয়টি গাভির আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৫ লাখ টাকা।
বিশাপাড়া গ্রামের আরেক খামারি হারেছ আলীর স্ত্রী সাহেদা বেগম (৪০) জানান, প্রায় আট বছর আগে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে স্বল্প সুদে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এবং ছয়টি গাছ বিক্রি করে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় দুটি বিদেশি জাতের বকনা গরু কিনেছিলেন। সেই গরু থেকেই ধীরে ধীরে তাদের খামার বড় হয়েছে। বর্তমানে খামারে আটটি গাভি রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি গাভি থেকে প্রতিদিন ৫৫ থেকে ৬০ কেজি দুধ পাওয়া যায়।
সাহেদা বেগম বলেন, গত কয়েক বছরে নয়টি গরু প্রায় ২৫ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। সেই অর্থে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন এবং এক বিঘা জমি কিনে সেখানে গাভির জন্য ঘাস চাষ করছেন।
হাকিমপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মোনতাসীর মামুন বলেন, আধুনিক পদ্ধতিতে গাভি পালন ও পরিচর্যার বিষয়ে বিশাপাড়া গ্রামের খামারিদের নিয়ে নিয়মিত উঠান বৈঠক করা হয়। কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে মেডিকেল টিমের মাধ্যমে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘দুগ্ধ ভিলেজ’ হিসেবে পরিচিত বিশাপাড়া গ্রাম বর্তমানে দুধ উৎপাদনের একটি মডেল গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।