প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ৭, ২০২৬, ৩:৩৮ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ৬, ২০২৬, ২:০৪ পি.এম
শক্তিশালী প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত স্থিতিশীল: বিশ্বব্যাংক

ঢাকা: শক্তিশালী প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত স্থিতিশীলতা দেখাচ্ছে। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যাংকিং, জ্বালানি ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব খাতে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
আজ প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ উন্নয়ন সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি কমে গেছে। জ্বালানি খাতের সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে ঘাটতির পাশাপাশি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চাপ তৈরি করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম জোরদার হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে।
রাজধানীতে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক কার্যালয়ে আজ দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক হালনাগাদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রানজিস্কা ওহন্সর্জ দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা ও নাজমুস সাদাত খান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে।
জ্যঁ পেসমে বলেন, অর্থনীতির আরও অবনতি ঠেকিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ নির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে হলে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং আরও বেশি ও ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে জ্বালানি সংকট কমানো, আর্থিক খাত পুনর্গঠন এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর কথা বলেছে।
জ্বালানি খাত স্থিতিশীল করতে দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের অবকাঠামো উন্নত করা এবং জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা উন্নত করা এবং সিস্টেম লস কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ও জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
আর্থিক খাতের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই দ্রুত শেষ করে কার্যকারিতা বিবেচনায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যাংক পুনর্গঠনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা বাড়াতে আইন ও বিধিবিধানে সংস্কার, নিয়ন্ত্রক ছাড় ধীরে ধীরে প্রত্যাহার এবং খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির কার্যকর কাঠামো তৈরির সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক।
এ ছাড়া আমানত সুরক্ষা তহবিলের ব্যবহার স্পষ্ট করা এবং জরুরি তারল্য সহায়তার জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে।
রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করনীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসনের দায়িত্ব আলাদা করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সমন্বিত করদাতা তথ্যভান্ডার ও কর শনাক্তকরণ নম্বরের মাধ্যমে কর প্রশাসন ডিজিটাল করার পাশাপাশি যথাযথ লক্ষ্যভিত্তিক নয়—এমন কর অব্যাহতি ও প্রণোদনা ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে।
ভ্যাট ব্যবস্থাও সহজ করার পরামর্শ দিয়ে সংস্থাটি বলেছে, ভ্যাটের হার একীভূত করা ও অব্যাহতি কমানোর পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ও সম্পত্তি করের প্রশাসন আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের প্রায় অর্ধেকই এখনো কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই।
সীমিত সরকারি অর্থ যেন প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য এসব কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি আরও উন্নত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারের ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ বা গতিশীল সামাজিক নিবন্ধনব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
এই সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্যের ভিত্তিতে উপকারভোগী নির্বাচন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন উপকারভোগী অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে। এতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা ও লক্ষ্য নির্ধারণের ঘাটতি কমবে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, শুধু ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে আরও ভালোভাবে লক্ষ্যভিত্তিক করা গেলে অতিরিক্ত ১৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যের বাইরে রাখা সম্ভব। আর ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বিদ্যমান নগদ সহায়তা ও খাদ্য কর্মসূচিগুলো সমন্বয় করে লক্ষ্যভিত্তিকভাবে পরিচালনা করা গেলে আরও ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হতে পারে।
এ জন্য ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রির সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড এবং প্রস্তাবিত কৃষক কার্ডসহ অন্যান্য সহায়তা ও ভর্তুকি কর্মসূচির সংযোগ স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশের উচিত ব্যাপকভিত্তিক ভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক ও সংকটের সময় দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম সহায়তা ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়া। এর লক্ষ্য হবে যাদের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, তাদের কাছে সরকারি সহায়তা আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে বৈশ্বিক ধাক্কা সামলেও অঞ্চলটির অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
তবে বৈশ্বিক চাপ বাড়ায় ২০২৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, কঠিন বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়া উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে অঞ্চলটির দেশগুলোকে প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে।
তিনি বলেন, দ্রুত সম্প্রসারিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খল থেকে সুযোগ নিতে হলে দক্ষতা, অবকাঠামো এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শ্রমিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। তবে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় এ অঞ্চলে এর ব্যবহার এখনো অনেক পিছিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কৌশলগত ব্যবহার দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস তৈরি করতে পারে।
Copyright © 2026 Positivebdnews24. All rights reserved.