মোঃ আফজাল হোসেন, দিনাজপুর প্রতিনিধিঃ দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৩ নম্বর ইউনিট প্রায় ৫১ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে সংস্কারের পরও উৎপাদনে যেতে পারেনি। দীর্ঘ প্রায় সাত মাস পর জেনারেল ওভারহোলিং (সংস্কার) শেষে প্রায় ৫১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে চালু করা হয়েছিল দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২৭৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ৩ নম্বর ইউনিট। কিন্তু উৎপাদনে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বিকল হওয়ায় ইউনিটটি আবারও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এতে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি প্রায় অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। চীনা কোম্পানির ওপর নির্ভর করে এখানে স্থাপিত হয় তিনটি ইউনিট। তার মধ্যে ২ নম্বর ইউনিটটি প্রায় ৮ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ১ নম্বর ইউনিটটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। এভাবে বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে সরকার কোটি কোটি টাকা সংস্কারের নামে খরচ করছে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এখানে ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমান কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের এই ইউনিটগুলো এখন চলাচলের উপযোগী নয়।
এখানে প্রকৌশলীসহ প্রায় দুই শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। তাদের জন্য মাস গেলেই কোটি কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে। এ দায়ভার কার? সরকার এখানে যেভাবে অর্থ ব্যয় করছে, তাতে রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।
কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর ৩ নম্বর ইউনিটটি জেনারেল ওভারহোলিংয়ের জন্য বন্ধ করা হয়। দীর্ঘ সংস্কার কাজ শেষে গত ২০ মে বিকেলে ইউনিটটি পুনরায় চালু করা হয়। সংস্কার কাজে ব্যয় হয় ৪ দশমিক ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকার সমপরিমাণ। তবে উৎপাদন শুরুর মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, ২৫ মে ইউনিটটির দুটি বড় ধরনের যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যায়। এতে ইউনিটটি জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে বিকল যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যুৎকেন্দ্রের একাধিক প্রকৌশলী ও কর্মচারী অভিযোগ করেন, ওভারহোলিংয়ের সময় প্রয়োজনীয় নতুন যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপনের পরিবর্তে পুরোনো যন্ত্রাংশ মেরামত ও ঘষামাজা করে পুনরায় ব্যবহার করা হয়েছে। এ কারণেই চালুর অল্প সময়ের মধ্যে ইউনিটটি বিকল হয়ে পড়েছে বলে জানা যায়। তাদের ভাষ্য, সংস্কার কাজে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের যথাযথ তদারকির অভাব এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতার ঘাটতির কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক। তিনি বলেন, ৩ নম্বর ইউনিটটি চালুর পাঁচ দিনের মাথায় দুটি বড় ধরনের যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ করতে হয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ চীন থেকে আনা হচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ইউনিটটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে। অন্তত আরও দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
তিনি আরও জানান, চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পূর্ববর্তী চুক্তি অনুযায়ী ৪ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ওভারহোলিংয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রের ১ নম্বর ইউনিট চালু রয়েছে এবং সেখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
কেন্দ্র পরিচালনা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে উত্তোলিত কয়লা ব্যবহার করে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হারবিন ইন্টারন্যাশনাল। চুক্তি অনুযায়ী উৎপাদন সচল রাখতে নিয়মিত মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সরবরাহের দায়িত্ব থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি তা যথাযথভাবে পালন করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, ৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে মোট তিনটি ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে ১ ও ২ নম্বর ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১২৫ মেগাওয়াট করে এবং ৩ নম্বর ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ২৭৫ মেগাওয়াট। তবে কেন্দ্রটি চালুর পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সময়ই তিনটি ইউনিট একসঙ্গে চালু রেখে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়নি। সংস্কার কাজ শেষ হলে ৩ নম্বর ইউনিটটি উৎপাদনে যাবে। এরপর উত্তর অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে বলে প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আবু বক্কর সিদ্দিক জানান।