বিশেষ প্রতিনিধিঃ: দিনাজপুরে পূজা-অর্চনা, কীর্তন ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সম্প্রদয়ের ৩ দিন ব্যাপী ৫২তম মহাত্রিপুরারী কৈলাশপতির মহাস্নান যাত্রা উৎসব গতকাল রোববার শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
আজ সোমবার সকালে দিনাজপুর শহরে আনন্দ সাগর পাড়ে অবস্থিত বলো বম মন্দিরে শিবলিঙ্গে ভক্তদের পানি ঢালা এবং আগত ভক্তদের পানি সংগ্রহ করার মধ্যে দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সম্প্রদায়ের হাজার হাজার ভক্তদের অংশ গ্রহণে তাদের মহা উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
মন্দিরের পুরোহিত ঠাকুর জগন্নাথ ব্রহ্মচারী বাসস’কে বলেন, দেশ ও মানুষের শান্তি-মঙ্গল এবং শিব ঠাকুরকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে প্রতি বছর ঝুলন যাত্রা থেকে রাখি পূর্ণিমার মধ্যবর্তী সোমবার তিথিতে এ উৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সম্প্রদয়ের ভক্তরা পালন করেন।
উৎসবকে ঘিরে দিনাজপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ ভক্ত ও পুণ্যার্থীদের সমাগম ঘটে শহরের আনন্দ সাগর এলাকায় অবস্থিত বল বোম শিব মন্দির প্রাঙ্গনে। গতকাল রোববার সন্ধার পর থেকে পুণ্যজল সংগ্রহ করে ভক্তরা আনন্দ সাগরস্থ বলো বম শ্রী শ্রী গোষ্ঠধাম শিব মন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থান নিয়েছেন। গত পরশু শনিবার ১৫ আগষ্ট দিবাগত রাতে বাস ও ট্রাকযোগে প্রায় ৩৪ মাইল দূরে অবস্থিত জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার মহুয়াগাঁ গ্রামের শ্মশানঘাট মন্দির সংলগ্ন পুনর্ভবা নদীর উত্তরমুখী প্রবাহিত জল সংগ্রহ করতে যান হিন্দু সম্প্রদায়ের হাজার হাজার ভক্ত-পুণ্যার্থী। সেখানে রাতভর কীর্তন পূজা অর্চনা অনুষ্ঠিত হয়।
গতকাল রোববার আকাশে সূর্য দেখা দেয়ার সাথে সাথে হাজার হাজার হিন্দু সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ ও ভক্তরা উত্তরমুখী প্রবাহিত পুনর্ভবা নদীর পানিতে নামেন। এরপর তারা সূর্যদেবকে প্রণাম করে পুণ্যজল সংগ্রহ করেন।
পরে ওই জল স্থানীয় শিব মন্দিরে ঢেলে একই নিয়মে আবারও জল সংগ্রহ করেন। পুরোহিতের মাধ্যমে সেই জল পবিত্র করে দিনাজপুরে নিয়ে আসেন সকল ভক্তরা।
রোববার সন্ধ্যায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভক্তরা দিনাজপুর শহরের আনন্দ সাগর পাড়ে অবস্থিত বল বম শ্রী শ্রী গোষ্ঠধাম মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে শিব মন্দিরের উদ্দেশ্যে খালি পায়ে ভক্তরা যাত্রা শুরু করেন। এ সময় ‘বল বম, বল বম’ ধ্বনিতে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। প্রতি বছর মহুয়াগাঁ এলাকার নদীতে হাজার হাজার ভক্ত-পুণ্যার্থী পুণ্যজল সংগ্রহ করতে আসেন।
অন্যদিকে, একই নিয়মে আনন্দ সাগর থেকে প্রায় ৭ মাইল পূর্বে কাঁউগাঁও-সাহেবগঞ্জ হাট সংলগ্ন আত্রাই নদীর উত্তরমুখী প্রবাহিত পুণ্যজলও সংগ্রহ করেন হাজারো হিন্দু সম্প্রদয়ের নারী-পুরুষ ভক্তরা। পুণ্যজল সংগ্রহের পর তাঁরা খালি পায়ে আনন্দ সাগর পাড়ে অবস্থিত মন্দিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
দুই দিক থেকে পুণ্যজল সংগ্রহ শেষে ভক্ত-পুণ্যার্থীরা গতকাল রাতে আনন্দ সাগর পাড়ে অবস্থিত বল বম, শ্রী শ্রী গোষ্ঠধাম শিব মন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থান করেন। সেখানে রাতভর ভক্তরা কীর্তন ও পূজা অর্চনা করেন। আজ সোমবার সকালে প্রসাদ বিতারণের মধ্যে দিয়ে তাদের ধর্মীয় মহা উৎসব সম্পন্ন ও সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।
আয়োজকেরা জানান, আজ সোমবার ভোর ৪টা থেকে শুরু হয় শিবঠাকুরের মাথায় পুণ্যজল ঢালার আনুষ্ঠানিকতা। সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সম্প্রদায়ের হাজার হাজার ভক্ত-পুণ্যার্থীরা শিব-লিঙ্গের মাথায় পুণ্যজল ঢেলে নিজের এবং সর্বজনীন মঙ্গল কামনায় পূজা-অর্চনা করেন। সোমবার সকালে আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে আগত ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
উৎসবে অংশ নেয়া ভক্ত রঞ্জন ভট্টাচার্য, সুলেখা ঘোষ ও প্রশান্ত কুমার বাসস’কে বলেন, পুণ্য অর্জন এবং নিজের পরিবার ও দেশের মানুষের মঙ্গল কামনায় তাঁরা এই পূজা করছেন। আবার অনেকে নিজেদের মনোবাসনা পূরণ, লেখাপড়ায় ভালো ফল এবং জীবনের বিভিন্ন কল্যাণ কামনায় এই পূজায় অংশ নেয়। তাঁদের বিশ্বাস,শিব-ঠাকুরের মাথায় পুণ্যজল ঢেলে পূজা করলে বাবা-মা স্বামী-স্ত্রীর মঙ্গল কামনায় আশীর্বাদ পাওয়া যায়। সেই সাথে যে নারী এই পুজা করেন তার স্বামীর মঙ্গল হয়।
দিনাজপুর বল বম সেবা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অশোক আগরওয়ালা বাসস’কে জানান, ১৯৭৪ সালে দিনাজপুর শহরে আনন্দ সাগর পাড়ে অবস্থিত মন্দিরে মহাত্রিপুরারী কৈলাশপতির মহাস্নান যাত্রা উৎসবের সূচনা করা হয়েছিল। এরপর থেকে প্রতি বছর নিয়মিতভাবে এই মহোৎসব উৎসব মুখর পরিবেশে পালিত হয়ে আসছে।
তিনি জানান, যে কোন মনোবাসনা নিয়ে কেউ আন্তরিকভাবে শিবঠাকুরের পূজা করলে তার মনোবাসনা পূর্ণ হয়, ভক্তদের মধ্যে এমন বিশ্বাস রয়েছে। সেই বিশ্বাস থেকেই প্রতি বছর মহাত্রিপুরারী কৈলাশপতির মহাস্নান যাত্রা ও পূজার আয়োজন করা হয়ে থাকে। এবারেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। শান্তিপূর্ণভাবে এই পূজা অর্চনা সম্পন্ন হয়েছে।
দিনাজপুর পুলিশ সুপার মো. জেদান আল মুসা বাসস’কে জানান,সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় মহা উৎসব, মহাস্নান যাত্রা গতদিনব্যাপী হাজার হাজার ভক্তদের অংশ গ্রহণে শহরে আনন্দ সাগর শিব মন্দির প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমরা তাদের ধর্মীয় উৎসবে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, এজন্যপর্যন্ত পুলিশ মোতায়েন করে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছি। ফলে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে আজ সোমবার সকালে প্রসাদ বিতরণ মধ্য দিয়ে তাদের ধর্মীয় উৎসব সম্পূর্ণ হয়েছে বলে তিনি জানান।