👁 444 Views

জেলা প্রশাসকের পরামর্শে জিপিএ-৫, চিকিৎসক হতে চায় সাদিয়া

বিশেষ প্রতিনিধিঃ পড়াশোনার খরচ চালাতে আর্থিক সহযোগিতার আবেদন নিয়ে দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়েছিল হতদরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন। সেদিন জেলা প্রশাসকের করা কয়েকটি সহজ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি সে। তবে হাল ছাড়েননি জেলা প্রশাসক। সহযোগিতার পাশাপাশি সাদিয়াকে দেন পড়াশোনার কৌশল, সময় ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত অনুশীলনের পরামর্শ।

প্রতি বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এসে সাদিয়াকে অগ্রিম এক সপ্তাহের পড়া বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এরপর টানা চার মাস ধরে প্রতি বুধবার গণশুনানির দিনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আসে সাদিয়া। নিয়মমতো অগ্রিম সাত দিনের পড়া নিয়ে গেছে এবং পূর্ববর্তী সপ্তাহের পড়াও বুঝিয়ে দিয়েছে। জেলা প্রশাসকের দেওয়া নিয়ম মেনে রাতে দুই ঘণ্টা, ভোরে দুই ঘণ্টা পড়াশোনা, বিকেলে খেলাধুলা এবং নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলে সে।

ফলও এসেছে চমকপ্রদ। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় দিনাজপুর শহরের কাদের বক্স মেমোরিয়াল কলেজিয়েট হাইস্কুল, পুলহাট থেকে ৪৩ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ২১ জন পাস করলেও বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন একমাত্র জিপিএ-৫ অর্জন করে বিদ্যালয়ের সেরা শিক্ষার্থী হয়েছে।

সাদিয়ার এই সাফল্যে গর্বিত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মকসেদ আলী। তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম বিদ্যালয়ের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় উৎসাহ দিতেন। মাঝেমধ্যে জেলা প্রশাসক বিভিন্ন ক্লাসে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বিভিন্ন কৌশল ও নিয়ম-কানুন শেখান। সেদিন থেকেই সাদিয়া তার পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করতে শুরু করে। কঠোর পরিশ্রম, নিয়মিত পড়াশোনা ও অধ্যবসায়ের ফলেই সাদিয়া জিপিএ-৫ পেয়েছে।’

সাদিয়ার মা আরফা বানু জানান, সংসারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। তিনি নিজেও অসুস্থ। বাবা সেলিম শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তিন মেয়ের মধ্যে সাদিয়া বড়। আর্থিক সংকটের কারণে মেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকলেও সাদিয়ার সাফল্যের পর এখন নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

সাদিয়া জানায়, একসময় তার স্বপ্ন ছিল নার্স হওয়ার। কিন্তু জেলা প্রশাসকের পরামর্শ ও উৎসাহ তার আত্মবিশ্বাস বদলে দিয়েছে। এখন সে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। নিজের পরিবারের পাশাপাশি অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা করতে চায় এবং ছোট বোনদেরও বড় স্বপ্ন দেখাতে চায়।

এসএসসির ফল প্রকাশের পরও থেমে নেই সাদিয়া। বাড়িতে মায়ের কাছ থেকে সেলাইয়ের কাজ শিখছে, পাশাপাশি ইংরেজি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। ভালো একটি কলেজে ভর্তি হয়ে এইচএসসিতে ভালো ফল করে মেডিকেলে পড়ার প্রস্তুতি নিতে চায় সে।

দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে সঠিক সময়ে একটু দিকনির্দেশনা পেলেই সমাজের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী নিজেদের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারে। সাদিয়ার পরিবার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সহযোগিতা চেয়ে এসেছিল। তখন তাকে বলা হয়েছিল, চার মাস পর সহযোগিতার বিষয়টি দেখা হবে। কিন্তু তার আগেই নিয়মিত পড়াশোনা, অধ্যবসায় ও পরিশ্রম তাকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের পথে এগিয়ে নেয়।

তিনি বলেন, সাদিয়া একা নয়—দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের প্রয়োজন সামান্য সহযোগিতা ও উৎসাহ। অপচয় কমিয়ে এসব শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো গেলে তারা ভবিষ্যতে পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

সাদিয়ার গল্প তাই শুধু একটি জিপিএ-৫ পাওয়ার গল্প নয়; এটি সঠিক দিকনির্দেশনা, অধ্যবসায় ও স্বপ্ন দেখার সাহসের গল্প।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *