👁 93 Views

রিক্সায় বাদাম বিক্রি করে চলছে আসাদুলের সংসার

মোঃ আফজাল হোসেন,  দিনাজপুর প্রতিনিধি : দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলা শিবনগর ইউপির দাদপুর গ্রামের পাবিহীন আসাদুলের সংসার চলছে রিক্সায় বাদাম বিক্রি করে। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের দাদপুর গ্রামের কাঁচামাটির রাজা ধরে এগোলেই চোখে পড়ে এক ব্যতিক্রমী মানুষ। রিক্সার ওপর সারি করে সাজানো বাদাম, বুট আর চিপস। রিক্সার আসনে বসে থাকা মানুষটির বয়স মাত্র ৩৮ বছর। নাম আসাদুল। তাঁর দুই পা নেই। কিন্তু এই অক্ষমতাই তাঁর জীবনের শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং এই রিক্সাই তাঁর জীবনযুদ্ধের প্রধান অস্ত্র। আসাদুল দাদপুর গ্রামের মৃত্যু আব্দুস ছামাদের পুত্র।

আসাদুলের সংসারে রয়েছেন স্ত্রী, দুই সন্তান বৃদ্ধ মা। পাঁচজনের এই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি নিজেই। বিশেষ ভাবে তৈরি রিক্সার প্যাডেল ঠেলেন হাত দিয়ে। আর এই হাতে ঠেলা রিক্সায় প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রাম থেকে বাজার, বাজার থেকে মহল্লাঘুরে ঘুরে বাদাম, বুট, চিপস বিক্রি করেন। আয় খুব বেশি নয়, তবু সেই অল্প আয়ের মধ্যেই তিনি চালান সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা আর মায়ের চিকিৎসা ছাড়াও নিজেকে চলতে হয়।

রিক্সায় বসেই তিনি সব কাজ করেন। পণ্য সাজানো, ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়া, দরদামসবকিছুই করেন হাত আর শরীরের কৌশলে। পথচলার কষ্ট, মানুষের দৃষ্টি, কখনো অবহেলাসবই সয়ে নিতে হয় তাঁকে। তবু মুখে কখনো অভিযোগ নেই। বরং নিজের শ্রমে বেঁচে থাকার একদৃঢ় প্রত্যয়ই ফুটে ওঠে তাঁর চোখেমুখে।

নিজের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়ের কথা বলতে গিয়ে আসাদুল কিছুক্ষণ নীরব হয়ে যান। তারপর ধীর কণ্ঠে জানান, প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বছর আগে ফুলবাড়ী রেলস্টেশনে চলন্ত ট্রেনে বাদাম বিক্রি করতেন তিনি। একদিন অসাবধানতায় চলন্ত ট্রেনের নিচে পড়ে যান।

মুহূর্তের মধ্যেই বদলে যায় পুরো জীবন। সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় শরীরের অত্যাবশ্যকীয় পা চিরতরে হারান তিনি।

দুর্ঘটনার পর দীর্ঘদিন হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে তাঁকে। শারীরিক যন্ত্রণা তো ছিলই, তার চেয়েও বড় ছিল মানসিক কষ্ট। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, সংসারের দায়সব মিলিয়ে একসময় মনে হয়েছিল জীবন বুঝি এখানেই থেমে গেল। কিন্তু পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ভেঙে পড়লে চলবে না।

সেই সিদ্ধান্ত থেকেই শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। ভিক্ষার পথ বেছে না নিয়ে তিনি বেছে নেন পরিশ্রমের পথ। ধীরে ধীরে রিজয় করে পণ্য

বিক্রির কাজ শুরু করেন। শুরুটা ছিল কঠিন, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভ্যাস আর আত্মবিশ্বাসই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।

স্থানীয় লোকজন বলেন, আসাদুল শুধু একজন প্রতিবন্ধী মানুষ নন, তিনি একজন সংগ্রামী যোদ্ধা। অনেক সুস্থ মানুষ যেখানে কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করেন, সেখানে দুই পা না থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রতিদিন রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন জীবিকার তাগিদে। তাঁর জীবনকাহিনি নতুন প্রজন্মের জন্য বড় এক শিক্ষা।

আসাদুলের স্বপ্ন খুব বড় নয়। তিনি চান, সন্তানরা যেন লেখাপড়া শিখে ভালো মানুষ হয়। চান, বৃদ্ধ মা যেন ঠিকমতো চিকিৎসা পায়।

আর চানসমাজ যেন অক্ষম মানুষদের করুণা নয়, সম্মানের চোখে দেখে। তিনি বলেন, সরকারি সহায়তা বলতে নাম মাত্র প্রতিবন্ধি ভাতা পান।

তাও তিন মাস পর পর। তাই তাকে এভাবে সংসারের ঘানি টানতে হচ্ছে। তিনি বলেন হাতে ঠেলা এই রিক্সার বদল যদি একটা ব্যাটারি চালিত রিক্সা হতো তাহলে অনেক ভাল হতো।

দুই পা না থাকলেও আসাদুলের জীবন থেমে নেই। প্রতিদিন রিক্সার চাকা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে তাঁর জীবনের সংগ্রামও। সীমাহীন কষ্ট আর প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি প্রমাণ করে চলেছেনমানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো দুর্ঘটনাই জীবনকে সম্পূর্ণ থামিয়ে দিতে পারে না।

শিবনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সামেদুল ইসলাম মাস্টার এর সাথে কথা বললে তিনি জানান, আসাদুলের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তবে এখন জানলাম তার জন্য আমি সবরকম সহযোগীতা করব। এমন ব্যক্তিদেরকেই তো সহযোগীতা করতে এগিয়ে আসা উচিৎ।

×

শেয়ার করুন:

Download High Quality Image

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *