সক্ষমতার তুলনায় অনেক পিছিয়ে মোংলা বন্দর বছরে দেড় কোটি টন কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা, হয়েছে ৯৯.৫০ লাখ টন

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার: সক্ষমতার তুলনায় এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর বাগেরহাটের মোংলা। বছরে ১ কোটি ৫০ লাখ টন কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা থাকলেও গত অর্থবছরে বন্দরে হ্যান্ডলিং হয়েছে ৯৯ লাখ ৫০ হাজার টন। তবে আগের অর্থবছরের তুলনায় কার্গো হ্যান্ডলিং বেড়েছে ৮ শতাংশ। একই সময়ে কনটেইনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। আর রাজস্ব আয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে বন্দরটি। গত অর্থবছরে মোংলা বন্দরের রাজস্ব আয় হয়েছে ৩৪৮ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি এবং বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) খালিশপুরের পোর্ট অডিটোরিয়ামে খুলনায় কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য জানান মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা।

বন্দর চেয়ারম্যান জানান, বছরে প্রায় দেড় হাজার জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা রয়েছে মোংলা বন্দরের। অথচ গত অর্থবছরে বন্দরে এসেছে মাত্র ৮১৫টি জাহাজ। একইভাবে বছরে ১ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা থাকলেও গত অর্থবছরে হ্যান্ডলিং হয়েছে মাত্র ১৯ হাজার ৭৯৪ টিইইউএস।

অর্থাৎ কার্গো, জাহাজ ও কনটেইনার—তিন ক্ষেত্রেই বন্দরের বিদ্যমান সক্ষমতার একটি বড় অংশ এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তবে সীমিত ব্যবহারের মধ্যেও কার্গো হ্যান্ডলিং ও রাজস্ব আয়ে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

চেয়ারম্যান বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আমদানি-রপ্তানি চাহিদা পূরণে মোংলা বন্দরের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্যেও বন্দরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা ও নৌপথ উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

মোংলা বন্দরের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নাব্যতা সংকট। বর্তমানে চ্যানেলের গভীরতা ৬ দশমিক ৫ মিটার। জোয়ারের সময় সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ বন্দরে আনা হচ্ছে। বন্দরের লক্ষ্য চ্যানেলের গভীরতা ৭ দশমিক ৫ মিটার বজায় রাখা।

এ লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং শুরু হয়েছে। এতে ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

বন্দর চেয়ারম্যান জানান, ড্রেজিংয়ের ব্যয় কমাতে নদীশাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রস্তাব সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছে। জয়মণিরঘোলে টার্মিনাল নির্মাণ করা গেলে পলি জমার প্রবণ এলাকাগুলোতে ড্রেজিংয়ের চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।

মোংলা বন্দর আধুনিকায়নে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় দুটি কনটেইনার টার্মিনাল, ডেঞ্জারাস কার্গো ইয়ার্ড এবং আধুনিক পণ্য হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া পোর্ট অপারেটিং সিস্টেম ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে মোংলা বন্দরকে স্মার্ট বন্দরে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চেয়ারম্যান জানান, রামপাল থেকে আল্ট্রা সুপার পাওয়ার প্ল্যান্ট পর্যন্ত পশুর চ্যানেল ড্রেজিংয়ে ৭৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে বয়া লেইং ভেসেল, সার্ভে ভেসেল, ফায়ার ফাইটিং ভেসেল ও পাইলট মাদার ভেসেল সংগ্রহের কাজও চলছে।

মোংলা বন্দরের রেললাইন পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না বলেও জানান চেয়ারম্যান। প্রায় ৫০০ মিটার রেললাইন সম্প্রসারণ করা গেলে বন্দরের পণ্য সরাসরি পরিবহনের সুযোগ আরও বাড়বে।

পাশাপাশি ঢাকা-মোংলা চার লেন সড়ক এবং খুলনা অঞ্চলে বিমানবন্দর নির্মাণ করা হলে বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

বন্দর ব্যবহারকারীদের সেবা সহজ করতে ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু রয়েছে। অধিকাংশ সেবা ও পেমেন্ট অনলাইনে আনা হয়েছে। ই-পেপার সার্ভিসের কাজও শেষ হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে এটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, মোংলা বন্দরের বিদ্যমান সক্ষমতার পুরোপুরি ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশের রাজস্ব আয়ে বন্দরটি আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। সে লক্ষ্যেই বর্তমান প্রশাসন কাজ করছে। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, পরামর্শ ও সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর মো. শফিকুল ইসলাম সরকার, সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) (দায়িত্বপ্রাপ্ত) প্রকৌশলী শেখ শওকত আলী, প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কমান্ডার এস এম আফজালুল ইসলাম, পরিচালক (বোর্ড) কালাচাঁদ সিংহ, হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) মো. সালাহউদ্দিন কবির, প্রকৌশলী সগীর আহমেদ, প্রোগ্রামার ও সহকারী ট্রাফিক ম্যানেজার মো. শামীম হাওলাদার।

এ ছাড়া খুলনা প্রেসক্লাবের সভাপতি মোস্তফা সরোয়ার, সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলামসহ খুলনায় কর্মরত বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।