২০ বছর পলিথিনের নিচে সবুরা সরকারি ভাতা বন্ধ ঘর দেওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতা
06 Oct 2026
12:25 PM
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার: বয়স সত্তর পেরিয়েছে। স্বামী মারা গেছেন প্রায় দুই দশক আগে। সন্তান নেই, স্বজন নেই। একসময় ভিক্ষা করে নিজের খাবার জোগাড় করতেন। এখন শরীর আর সায় দেয় না। রোগে-শোকে বিছানায় পড়ে থাকা সেই বৃদ্ধার মাথার ওপর নেই একটি নিরাপদ ছাদও।দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যভান্ডার সুন্দরবনের উপকূলঘেঁষা বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার ঘোলা গ্রামের সত্তোরোর্ধ্ব সবুরা খাতুন। তিন কুলে আপন বলতে কেউ নেই। একসময় ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু বয়সের ভার আর নানা রোগে এখন তিনি শয্যাশায়ী। ভিক্ষা করেও আর জীবন চালানোর সক্ষমতা নেই তাঁর।
স্বামী রুস্তুম শেখ মারা গেছেন প্রায় ২০ বছর আগে। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই একটি পলিথিনে মোড়ানো ঝুপড়িতে বসবাস করছেন সবুরা। দীর্ঘ দুই দশক ধরে এই ঝুপড়িই তাঁর একমাত্র আশ্রয়। তবে বর্তমানে সেটিও বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাউনি ভেদ করে ঘরের ভেতর পানি পড়ে। আর রোদের তীব্রতায় পলিথিনের ঘরটি হয়ে ওঠে অসহনীয় গরম। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এমন দুর্বিষহ পরিবেশে বসবাস করলেও ভাগ্যে জোটেনি নিরাপদ মাথা গোঁজার ঠাঁই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চিতলমারীর বড়বাড়িয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ঘোলা জিবিডি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশে ছোট্ট একটি পলিথিনে মোড়ানো ঝুপড়িতে বসবাস করছেন সবুরা খাতুন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা কিংবা কোনো কাজকর্ম করতে পারেন না তিনি। সংসারে উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় প্রতিবেশীদের সহায়তা ও সামান্য বিধবা ভাতার ওপরই নির্ভর করে তাঁর জীবন।
ঝুপড়িটির চারপাশে বেড়া হিসেবে টানানো হয়েছে ছেঁড়া কাপড় ও প্লাস্টিকের বস্তা। ছাউনি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ছেঁড়া পলিথিন। সামান্য বাতাসেই যা উড়ে যায়। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। চারপাশে জমে থাকে স্যাঁতস্যাঁতে কাদা। ঘরের আসবাব বলতে রয়েছে একটি কলসি, কয়েকটি থালা-বাটি ও অল্প কিছু কাপড়-চোপড়।
ঘোলা গ্রামের বাসিন্দা সনিয়া বেগম বলেন, ‘সবুরা খাতুনের নিজের কোনো ভিটেমাটি নেই। আমার মা তাকে থাকার জন্য একটু আশ্রয় দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের সামর্থ্য নেই তাঁকে একটি ঘর তৈরি করে দেওয়ার। তাঁরও আপনজন কেউ নেই, ওষুধ-পথ্য কিনে দেওয়ার মতো কেউ নেই। বিষয়টি একাধিকবার জনপ্রতিনিধিদের জানানো হলেও এখনো স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। তাঁর জন্য দ্রুত একটি নিরাপদ ঘর প্রয়োজন। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদেরও তাঁর উপকারে এগিয়ে আসা উচিত।’
সবুরা খাতুন বলেন, ‘এ জগতে আপন বলতে আমার আর কেউ নেই। সবাই মারা গেছে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে এখন আর ভিক্ষা করতে পারি না। কিছু টাকা বিধবা ভাতা পেতাম। গত কোরবানির ঈদের পর থেকে সেই টাকাও পাচ্ছি না। এখন আমার বেঁচে থাকাটাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে।’
বড়বাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদ সরদার বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত মর্মান্তিক। সবুরা খাতুনের ব্যাপারটি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হবে।’
চিতলমারী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শেখ বজলুর রশীদ জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিধবা ভাতাসহ সরকারি সব ধরনের ভাতা প্রদান বন্ধ রয়েছে।
চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা আক্তার বলেন, ‘বিষয়টি আগে আমার জানা ছিল না। খবর পেয়ে আমি সবুরা খাতুনকে শুকনা খাবার—চাল, ডাল, আলু, লবণ ও তেল—প্রদান করেছি। তাঁর নিজস্ব কোনো জায়গা না থাকায় ঘরের বিষয়টি নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।’
একদিকে অসুস্থতা, অন্যদিকে নেই স্বজন, নেই নিরাপদ আশ্রয়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পলিথিনের ঝুপড়িতে দিন কাটানো সবুরা খাতুন এখন একটি নিরাপদ ঘর ও নিয়মিত সরকারি সহায়তার প্রত্যাশায় আছেন। তাঁর এই মানবেতর জীবনযাপনের অবসানে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা প্রয়োজন।