দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ দ্রুত শনাক্ত ও নির্ণয় এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে একটি জাতীয় চিকিৎসা প্রটোকল তৈরি করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ (এনসিডিসি) ও স্বাস্থ্য গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ আইসিডিডিআর,বি এর যৌথ উদ্যোগে প্রণীত এই প্রটোকলটি প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কিডনি রোগ শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনায় একটি মানসম্মত নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।
বিশ্ব কিডনি দিবস, ২০২৬ উপলক্ষ্যে ১২ মার্চ বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের কার্যালয়ে আয়োজিত এক অবহিতকরণ সভায় প্রটোকলটি প্রকাশ করা হয়।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বৈজ্ঞানিক ওয়ার্কিং গ্রুপ এই প্রটোকল প্রস্তুত করে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ ধীরে ধীরে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায় না এবং রোগ গুরুতর অবস্থায় পৌঁছানোর পর ধরা পড়ে।
‘প্রেভেল্যান্স অফ ক্রোনিক কিডনি ডিজিজ ইন বাংলাদেশ: অ্যা সিস্টেমেটিক রিভিউ অ্যান্ড মেটা এনালাইসিস’— শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রায় প্রতি চার জনের মধ্যে একজন কোনো না কোনোভাবে কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বেশি।
প্রতি বছর প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার মানুষ কিডনি বিকল হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছেন। ফলে দেশের সীমিত ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন সুবিধার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা জানান, এই রোগটি অনেক সময় নীরবে অগ্রসর হয়। ফলে রোগীরা শেষ পর্যায়ে যাওয়ার আগে বুঝতেই পারেন না যে তাদের কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ অথবা পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস থাকলে এ রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে। বিশেষ করে, উপকূলীয় অঞ্চলে পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত গরমে কাজ করা ও নিরাপদ পানির অভাবও কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
নতুন প্রটোকলের মূল লক্ষ্য হলো— প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মধ্যেই কিডনি রোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা যুক্ত করা। এই ব্যবস্থার আওতায় কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাররা (সিএইচসিপি) কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের প্রাথমিক পরীক্ষা করবেন এবং সন্দেহভাজন রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী উচ্চতর চিকিৎসা কেন্দ্রে রেফার করবেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকরা নির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী রোগ নির্ণয়, ঝুঁকি নির্ধারণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা করবেন।
এই প্রটোকলটি এনআইএইচআর-এর অর্থায়নে পরিচালিত একটি গবেষণা প্রকল্পের আওতায় তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আইসিডিডিআর,বি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের ডিজিটাল হেলথ প্ল্যাটফর্মে এই প্রটোকল যুক্ত করার কাজও করছে, যাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সহজে নির্দেশনাগুলো ব্যবহার করতে পারেন।
প্রটোকল প্রকাশ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কিডনি বিশেষজ্ঞ, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে কিডনি ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও প্রখ্যাত কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হারুন-উর-রশীদও অংশ নেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) প্রফেসর ডা. শেখ সাইদুল হক বলেন, ‘এই প্রটোকলটি বাংলাদেশে কিডনি রোগ মোকাবিলার পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
তিনি আরও বলেন, কমিউনিটি ও উপজেলা পর্যায়ে আগাম শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে হাজার হাজার মানুষকে কিডনি রোগের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওএসডি ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক লাইন ডিরেক্টর প্রফেসর ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এটি ইঙ্গিত করে যে রোগটি নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তাই স্ক্রিনিং ও রোগ নির্ণয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
এ সময় আইসিডিডিআর,বি-এর সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ডা. আলিয়া নাহিদ বলেন, ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে আগাম হস্তক্ষেপ রোগে মৃত্যুহার ও চিকিৎসা ব্যয় উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। দ্রুত সারা দেশে এই প্রোটোকল বাস্তবায়িত হলে এটি অসংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর মডেল হিসেবে কাজ করবে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ধাপে ধাপে সারা দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে এই প্রটোকল চালু করা হবে। এ জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।